প্রোগ্রামিং –এ প্রথম অনুরণন

11
Author: অধ্যাপক ড. সৈয়দ আখতার হোসেন
বিভাগীয় প্রধান, কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
ড্যাফোডিল ইন্টারেনেশনাল ইউনিভার্সিটি,
ধানমন্ডি, ঢাকা।

স্বভাবতই বিধাতা মানবসৃষ্টতে রেখেছেন সুমহান নিপুণতা। ভূমিষ্ঠ শিশুর বেড়ে ওঠা থেকে মায়ের প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসে আপন সৃজনশীলতায় চারপাশের সবকিছু কথা বলতে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠা শৈশবের মেধায় সঞ্চারিত হয় প্রকৃতি। তাই প্রোগ্রামিং এর বিষয়টা অনেকটা মজ্জাগত। লক্ষণীয় গাণিতিক সমস্যা সমাধানে শৈশবের সময়টাতে অর্জন উল্লেখযোগ্য। শৈশবের এই সময়ে মনে থাকে না কোন সংশয়, দ্বিধা বা সংকোচ। বরঞ্চ অজানাকে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। মানব মনের রয়েছে অসাধারণ ক্ষমতা। প্রোগ্রামিং বা কম্পিউটারকে সফল ভাবে ব্যবহার করে কোন সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো একটি সাধারণ অবস্থার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। যে কোন সমস্যা হৃদয়ের গভীরে নিয়ে যদি মনকে সংবেদনশীল ভাবনায় ধাপে ধাপে অনুভব করা যায়, সমস্যা যতই কঠিন হউক না কেন, সমাধানের রূপরেখা আজান্তেই দিগন্তে পাখা মেলে।

মনেপরে প্রথম প্রোগ্রামিং শেখার শিহরণ। আজও সেই শিহরণ একই উন্মাদনায় হৃদয়ে দোলা দেয়। ১৯৮৮ সালের এক বিকালে আমাদের বিভাগের শিক্ষক সবে ফিরেছেন উচ্চতর গবেষণা শেষে বিলেত থেকে। শখ করে এনেছেন ৩ ১/২ ইঞ্চি ফ্লপি ডিস্কে একটি বিশেষ সফটওয়্যার, প্রাণপ্রিয় শিক্ষকের জন্য। আমরা ২/৩ জন জেনে ফেললাম বিষয়টা। সময়মত বিভাগের শিক্ষকের রুমে চলে গেলাম, পিসিতে সফটওয়্যার দেখতে। আমাদের আগ্রহ দেখে বারণ সইলো না। দাড়িয়ে আছি তিনজনে, চেয়ারের পিছনে। বিলেত ফেরত শিক্ষক ফ্লপি ডিস্কটা মেশিনে ঢুকিয়ে কি যেন কমান্ড প্রম্পটে লিখলেন, সাথে সাথে একটি বিস্ময়কর চিত্র ফুটে উঠল মনিটর স্ক্রিনে। সেখানে ইলেকট্রনিক সার্কিট বানানোর সব চিহ্ন রয়েছে। একটা সার্কিট বানানো হল এবং সেটাকে যেন বিদ্যুৎ সরবরাহ করে চালানো হল। সাথে সাথে সার্কিটের প্রকৃতি অনুযায়ী একটা চিত্র তৈর হল। আমরা একদম হারিয়ে গেছি বিস্ময়ে, কি দেখছি! এও সম্ভব!। ১৯৮৮ সালের এই বিকালে কি যেন করে গেল, হৃদয়ের অভ্যন্তরে।

 

অপেক্ষা করছি বাহিরে। স্যারকে ধরলাম কি দিয়ে এমন বিস্ময়কর সৃষ্টি হয়েছে “বলেন স্যার”। একগাল স্মিত হাসি দিয়ে স্যার বললেন, “তোমরা এই ভাষা জানো না, এটার নাম ‘সি’” – অনেক কিছু এই ভাষা ব্যবহার করে করা যায়। আমরা সত্যিই ১৯৮৮ সালে এই ভাষার নাম শুনি নাই। কেমন অসহায় বোধ করলাম। কিন্তু মন বাধ সাধল। বেশ কিছু টাকা- এই সব মিলেয়ে হাজার ৬য়েক (৬০০০/=) হবে, আমার পকেটে স্কলারশিপ এর টাকা। ছুটে গেলাম ঢাকা নিউমার্কেটে। খুঁজতে খুঁজতে পেলাম আইডিয়াল লাইব্রেরিতে Osborne এর মূল বইখানা “C/C++: The Complete Reference” – হার্বার্ট শিল্ডের। মালিক বেশ অবাক, একমাত্র বই, দাম ৫০০০/= আমি একজন ছাত্র কিনেছি দেখে। মনে হলো হাতে আমার আকাশের চাঁদ। একছুটে এলাম আমার শিক্ষকের কাছে, দেখলাম – শিক্ষকতো অবাক – এই বই আমার হাতে! লোভ সামলাতে না পেরে ধার নিলেন আমার সদ্য আনা চাঁদের থালা। অনেক অনুনয় বিনয় করে ফিরে পেলাম যক্ষের ধন আমার প্রিয় বইখানা, তাতো সপ্তাহ তিনেক পর। হৃদয়ে তখন এক ভাবনা — বানাতে হবে স্বপ্নের সেই ছবিখানা – কেমন অপলোকে সার্কিট তৈরি করে ফলাফল দেখার এক চরম উত্তেজনায় সব ঘুম – ক্লান্তি চলে গেছে উবে।

১৯৮৮ সালের নভেম্বর বেশ ঠাণ্ডা। ব্যক্তিগত কোন কম্পিউটার নাই। আছে কম্পিউটার সেন্টার –  যেখানে ঘড়ি ধরে কাজ করতে হয় সকল নিয়মকানুন মেনে। শুরু হলো এক নীরব আন্দোলন – গড়ে প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা সি প্রোগ্রামিং এর পড়া আর – প্রয়োগের জ্ঞান অর্জনের নিরলস খেলা। মাথায় আমার ভূত চেপেছে – বানাতে হবে সেই স্বপ্নের ছবিখানা। শুরু হলো – বইয়ের আপাদমস্তক ঘেঁটে পাঁচ মাসের মাথায় প্রথম হাসতে দেখলাম আমার স্বপ্নের ছবিখানাকে। কখন যে নিজের অজান্তে ৭০০০ লাইন লিখে ফেলেছি জানি না।

অনেক শিক্ষক তখন জানে আমি এক পাগল – পাগলামোর খেলায় আমি মত্ত। জীবনে এমন উপলব্ধি আর নাই। লাইব্রেরী বানিয়ে VA List -এর প্রয়োগ একেবারে কম্পাইলরের অভ্যন্তরে কাজ করার যে সীমাহীন আনন্দ, হিমালয়ে আরোহণের চাইতে সেটা মোটেও কম নয়।

পরিশেষে বলব – শুরু থেকে শেষ অবধি সকল খেলায় কিছু না কিছু সহযোগিতা থাকবেই – তবে নিজের একান্তিক বাসনায় জাগ্রত সত্তায় কেবল সৃষ্টি সম্ভব।

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s